Welcome

ভাল থেকো হৃদয়

বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে হয় স্কুলের গণ্ডি পার না হওয়া ছেলেটির। দশম শ্রেণিতে পড়া ছেলেটি পুরো সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করে একরকম হাপিয়ে ওঠে। স্কুলে পড়ালেখা সামলিয়ে আবার সংসারের যাবতীয় কাজ করতে হয় তাকে। ছোট দু’টি ভাই ও একটি বোনের লেখাপড়াসহ সকল খরচ চালিয়ে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছুর যোগান দেয়া তার জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তবুও এগিয়ে যায় ছেলেটি মায়ের সাদা কাপড়ের দিকে চেয়ে। পাশের গ্রামে মামা বাড়ি থাকায় মামাদের বিভিন্ন পরামর্শ পেয়ে যায় অনায়াসে। বাবার পেনশনের টাকার জন্য বিভিন্ন অফিসে ধর্ণা দিতে দিতে ক্লান্ত ছেলেটির সাথে একদিন পরিচয় হয় অফিসের এক অফিসারের সাথে। সেই সূত্রে বাবার পেনশনের ফাইলটার কাজ দ্রুত শেষ হয়।

হৃদয় নামের এই ছেলেটির আজ মন খারাপের দিন। স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় এক বিষয়ে ফেল করেছে সে। স্কুলের শিক্ষক ও কমিটির সিদ্ধান্ত টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে তাকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবেনা। বাবা মারা যাওয়া ছেলেটির হৃদয় ভেঙ্গে যায় তখনই। বাবার মৃত্যুশোক এর কষ্ট ভুলতে না ভুলতে আরেক কষ্ট এসে সামনে হাজির। মূলতঃ বাবার মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। আবার বাবার পেনশনের টাকার জন্য দৌড়াতে গিয়েও স্কুল থেকে দুরে থাকতে হয়েছে তাকে। তার উপর সংসারের নানা ঝামেলায় থাকায় ঠিকমতো লেখাপড়া করা হয়ে ওঠেনি তার। লেখাপড়ায় বরাবার ভালো ছিলো সে। বাবার চাকুরীর সুবাদে পুলিশ লাইন্স স্কুলে পড়ার সুযোগ হয় হৃদয়ের। পুলিশ লাইনের মধ্যে বেড়ে ওঠা ও পুলিশ পরিবারের সন্তান হওয়ায় পুলিশের চাকুরী সম্পর্কে রয়েছে তার ভালো ধারণা। শেষ পর্যন্ত এক সিনিয়র কর্মকর্তার সুপারিশে হৃদয় এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পায় স্কুল থেকে।

এই সুযোগ পাওয়া তার হৃদয়ে এক বিশ্বাসের দাগ কাটে। লেখাপড়ায় মনযোগ দেয় চুড়ান্তভাবে। রাতদিন লেখাপড়া করে তার স্কুলের লেখাপড়ার গ্যাপ পূরণ করতে সমর্থ হয়। ফলাফল এসএসসি পরীক্ষায় এ+ পেয়ে যায় খুব সহজে। পুলিশ লাইন্স স্কুলে কলেজ শাখা না থাকায় ভর্তি হয় পাশের একটি সরকারী কলেজে। বাবা কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করার পুলিশের সর্বোচ্চ পুরস্কার মরনোত্তর বিপিএম পেয়ে যায় হৃদয়ে পরিবার। পদক নিতে গিয়ে পুলিশের আইজিপি মহোদয়ের সাথে তার কথা হয়। সংসারের অভাবের কথা শুনে হৃদয়কে পুলিশের চাকুরী দেয়ার আশ্বাস দেন তিনি। সামনে পুলিশের নিয়োগের সার্কুলার দিলে তাকে নিয়োগ দিতে আশ্বস্ত করেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় সার্কুলারে যে বয়স থাকার কথা তার চেয়ে দুই মাস বয়স কম থাকায় এবার হৃদয়ের চাকুরী অনিশ্চিত হয়ে যায়। কিছু শুভাকাঙ্খির পরামর্শে ছুটে যায় আইজিপি মহোদয়ের নিকট। আইজিপি মহোদয় দয়া পরবশ হয়ে দুই মাস বয়স কম থাকার পরও তাকে পুলিশের কনস্টেবল পদে ভর্তির জন্য যোগ্য অনুমোদন করেন।

ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে বাবার শেষ কর্মস্থলেই শুরু হয় হৃদয়ের প্রথম কর্মস্থল। মায়ের অসুস্থ শরীর আর ভাই বোনের লেখাপড়ার নানান চাহিদা মিটিয়ে বাবার পেনশনের টাকা আর নিজের বেতনের টাকায় ভালোই কাটিয়ে যাচ্ছিল হৃদয়ের সংসার। চাকুরীর পাশাপাশি নিজের লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছে হৃদয়। এইচএসসি পরীক্ষায় এ+ না পেলেও ৪.৬০ পেয়ে পাশ করে তাক লাগিয়ে দেয় সকলকে। ছোট বোনও এসএসসি পরীক্ষায় এ+ পেয়ে পাশ করে যায়। স্কুলের সহপাঠি মঞ্জুর সাথে হৃদয়ের যে সম্পর্ক ছিলো তা প্রেমের সম্পর্ক বলা যায়না। তাদের সাথে পারিবারিক একটা সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই সূত্রে তাদের বাসায় আশা যাওয়া ছিলো হৃদয়ের। মঞ্জুও এবার এইচএসসি পাশ করেছে। মাঝে মাঝে ফোনেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় তাদের। কিন্তু এরই মাঝে মঞ্জুর মনে যে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে তা বুঝতে পারেনি হৃদয়। মঞ্জুর বাবা অন্য একটি ছেলের সাথে বিয়ে কথা প্রায় পাকাপাকি করে ফেলে। জানতে পেরে মঞ্জু ফোন দেয় হৃদয়কে। বিস্তারিত জানার পর হৃদয়ের হৃদয়েও আচমকা এক ঝড় ওঠে। কি বলা উচিৎ ভেবে পায়না। সিদ্ধান্ত জানতে চায় মঞ্জু হৃদয়ের নিকট। বাবা হারা হৃদয় মায়ের পরনে সাদা কাপড়ের কথা চিন্তা করে থেমে যায়। ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেও থমকে যায় সে। দিতে পারেনা মঞ্জুকে কোন সিদ্ধান্ত।

আগামীকাল মঞ্জুর বিয়ের জন্য পাত্র পক্ষ আসবে মঞ্জুদের বাসায়। হৃদয় অফিসের কাজে ব্যস্ত। বেজে ওঠে ফোনের রিংটোন। মঞ্জুর ফোন পেয়ে অফিসের বাইরে গিয়ে কথা বলে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মঞ্জু। পাত্র পক্ষের সাথে কথা ফাইনাল হলে আগামীকালই হবে বিয়ে। পরে অনুষ্ঠান করে তুলে নিবে মঞ্জুকে। হৃদয় সময় চায় মঞ্জুর নিকট। কিন্তু সময় নেই মঞ্জুর হৃদয়কে সময় দেয়ার। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদেরকে। রাতে বাসায় গিয়ে মায়ের সাথে কথা বলে জানাবে বলে ফোন রেখে দেয়। অফিসের জরুরী কাজে হৃদয়কে যেতে হয় পাশের জেলায়। ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। বাসায় এসে দেখে মা অসুস্থ, মাথায় পানি দিচ্ছে ছোট বোন। প্রচণ্ড জ্বর আর মাথায় যন্ত্রণায় অস্থির। এই রাতে ডাক্তার বা ঔষধ পাওয়া যাবে না। তবুও ছুটে যায় হৃদয় হৃদয়ের টানে। সারাদিন বাইরে থাকায় মোবাইলটা তার বিদ্যুৎ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে আগেই। অনেক কষ্টে দুরের এক ঔষধের দোকান থেকে কিছু ঔষুধ নিয়ে বাসায় ফিরে দেখে বিদ্যুত লাইনের ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। মোবাইলে চার্জ দিতে না পারায় কথা বলতে পারেনা মঞ্জুর সাথে।

সকালে বিদ্যুৎ লাইন সচল হলে মোবাইলে চার্জ দেয় হৃদয়। মায়ের শরীর কিছুটা সুস্থ হওয়ায় মাকে পুরো বিষয়টি জানায় সে। হৃদয়ের মা তার ছেলের হৃদয়ের উত্তাপ বুঝতে পারে। তিনি রাজী হয়ে যান এক শর্তে। ডিগ্রি পাশ করে পুলিশের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পদে সরাসরি ভর্তি হতে হবে হৃদয়কে। ততোদিন অপেক্ষা করতে হবে মঞ্জুর পরিবারকে।

ততোক্ষণে অনেকটা সময় গেছে পার হয়ে। মোবাইলে কিছুটা চার্জ হলে হৃদয় ফোন দেয় মঞ্জুকে। মঞ্জুর ফোন বন্ধ পেয়ে মাকে নিয়ে ছুটে যায় হৃদয় মঞ্জুদের বাসায়। বাসার সামনে অনেক মানুষের জটলা দেখে কিছু একটা হয়েছে বলে ধারণা পেয়ে যায় তারা। বাসার ভিতরে গিয়ে মঞ্জুর নিথর মরদেহ দেখে আর বুঝতে বাকি থাকেনা হৃদয়ের। রাতে মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে ভুল বুঝে মঞ্জু চলে গিয়েছে হৃদয়ের হৃদয় থেকে অনেক দূরে। মঞ্জুর পড়ার টেবিলে পড়ে থাকা চিরকুটটি তুলে দেয় মঞ্জুর বাবা হৃদয়ের হাতে। তাতে লেখা “ভালো থেকো হৃদয় আমাকে ছাড়া”।

Leave a Reply