বেঁচে থেকো বাবা

২০০৮ সালে খুলনা সার্জিক্যালের আইসিইউ-তে যখন আমার বাবা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, গ্লাসের পাশে দাড়িয়ে আমি ও আমার ছোট ভাই পলাশ দু’দিকে চেয়ে কেঁদেছি নিরবে। মাঝে মাঝে পলাশের কান্না আমি দেখতে পেলেও আমার কান্না কখনও পলাশ দেখতে পায়নি। পাশে ওয়ালের দিকে চেয়ে কঠোর হচ্ছি আর মাঝে মাঝে পলাশকে সান্তনা দিচ্ছি। আমি বুঝতে পারছি আমার কান্না দেখলে পলাশকে সামলানো অনেক কঠিন হবে। মাকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি বাসায়। মা হয়তো সারারাত জায়নামাজেই কাটিয়েছেন। রাত যতো গভীর হচ্ছে বিষন্নতা ততো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সন্ধ্যায় অপারেশনের পর ডাক্তার জানালেন ২৪ ঘন্টা না গেলে কিছুই বলতে পারছেন না। তবে অপারেশনের সময় প্যানক্রিয়াসে যে সমস্যা দেখতে পেয়েছেন সেটা অপারেশনের আগে কোন টেস্টে ধরা পড়েনি বলে ডাক্তার জানালেন। আর সে কারনেই অপারেশনে সময় বেশী লেগেছে। অপারেশন সাকসেসফুল শব্দটি ডাক্তারের নিকট থেকে শোনার অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু শব্দটি না শুনতে পেরে চরম হতাশ হলেও পরিবারের আর কাউকে বিষয়টি বুঝতে দেইনি। মনের অজান্তে আইসিইউ-তে বাবার মৃত্যুর পথ চেয়ে চেয়ে দেখছি গ্লাসের ফাঁক দিয়ে। মাঝে মাঝে অচেতনে বাবা নড়া-চড়া করছেন আর কর্তব্যরত নার্স পাশে বসে শুশ্রূষা করছেন। সারারাত নার্স সামান্য সময়ের জন্যও বাবার নিকট থেকে সরে যাননি।

ব্লাড গ্রুপিং-এ পলাশের রক্তের মিল পাওয়ায় বাবার শরীরে পলাশের দেওয়া রক্ত সঞ্চালন করা হচ্ছে। একই সাথে স্যালাইনও দেওয়া হচ্ছে। রাত ২টা নাগাদ দুই ভাই লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছি হাসপাতালের বারান্দায়। আর বারবার বাবাবিহীন সংসারের কথা ভাবছি। ভাবছি গোপালগঞ্জের সেই ক্লিনিকের কথা যারা আমার বাবাকে ভুল চিকিৎসা করে মৃত্যু দুয়ারে ঠেলে দিয়েছে। মূলতঃ বাবার এপেনডিক্সের চরম ব্যাথার কারনে প্রথমে গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসক দেখে শুনে গ্যাসের ব্যাথা বলে মতামত দিয়ে ঘুমের ঔষধসহ আরো কিছু গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ঔষধ দিয়ে বিদায় দিয়েছিলেন। বাড়িতে আসার পর দুইদিন ঘুমের মধ্যে ছিলেন বাবা। এরই মধ্যে এপেনডিক্স ফেটে অসহনীয় ব্যাথায় আক্রান্ত হন। এরপর ঐ ক্লিনিকে নিয়ে গেলে এবার ডাক্তার ঠিকই রোগ ধরতে পারেন তবে বিপদ সরাতে তিনি দ্রুত খুলনা সার্জিক্যালে পাঠিয়ে দেন। যাই হোক সার্জিক্যালে গাজী মিজান সাহেবের চিকিৎসা চলতেছিলো। অবস্থা খারাপ হলেও তিনি আমাদেরকে সাহস দিচ্ছিলেন সব সময়। অবস্থা বিবেচনায় তিনি ঔষধ প্রয়োগে কিছুটা সুস্থ্য হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবেন বলে জানান।

কয়েকদিনে বেশ সুস্থ্য হয়ে উঠলেন বাবা। নরম খাবারের সাথে বেশ কিছু ঔষধ ও পথ্য নির্দেশনা দিয়ে সপ্তাখানেক পর হাসপাতালে আসতে বলেন ডাক্তার। আমার বাসা খুলনায় তাই বাবাকে বললাম আমার বাসায় থেকে ডাক্তার দেখানোর পর বাড়িতে যেতে। কিন্তু বাবার মনের জোর অনেক তাই আমার কথা না রেখে তিনি বাড়িতে চলে গেলেন। বাড়িতে যাওয়ার সময় গাড়ির ঝাকুনি এবং অনিয়ম খাওয়া-দাওয়া ও ঠিকমতো ঔষধ না খেয়ে পুনরায় সেই চরম ব্যাথায় আক্রান্ত হলেন। আবার সেই সার্জিক্যাল এবং নতুন করে চিকিৎসা। কিন্তু অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে তবু ডাক্তার কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। শেষ মূহুর্তে একদিন সকালে ডাক্তার গাজী মিজান সাহেব কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে তার গানের শুটিংয়ের জন্য ঢাকায় চলে গেলেন। দুপুরের দিকে বাবার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় আমরাই সিদ্ধান্ত নিলাম বাবাকে ঢাকা নিয়ে যাবো। সার্জিক্যালের ম্যানেজার বাবু ভাই সম্পর্কে আত্মীয় হওয়ায় মনের দুঃখে তাকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিলাম। হয়তো আত্মীয়তার কারনেই বাবু ভাই নিজেই উদ্যোগী হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজের জনৈক ডাক্তার (খুব সম্ভবত ডাঃ এনামুল) এর সাথে যোগাযোগ করলেন। তিনি এসে বাবাকে দেখে বেশ কিছু টেস্ট দিয়ে বলে গেলেন রিপোর্টগুলো নিয়ে সার্জিক্যালের সামনে তার বাসায় যেতে। বিকালে রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তার সাহেবের বাসায় গেলাম। তিনি রিপোর্ট দেখে বললেন সন্ধ্যায় অপারেশন। যথারিতি ঘন্টা দেড়েকের অপারেশন শেষে বাবা আইসিইউ-তে।

রাত দুইটার পর বাঁধাহীনভাবে কাঁদতে হাসপাতাল ছেড়ে বাসার দিকে রওনা হলাম। পলাশও আমি চলে যাওয়ায় কান্না করার একটা সুযোগ পেয়ে গেলো। আমি মটর সাইকেলে যেতে যেতে ভাবছি এই বুঝি পলাশ ফোন দিলো “বাবা নেই”। না পলাশের কোন ফোন ছাড়াই বাসায় গিয়ে আনমনে কিছু সময় কাঁদলাম। তারপর কোন সময় ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে চলে যাই সার্জিক্যালে। নার্স জানলেন বাবার জ্ঞান ফিরেছে তবে এখন ঘুমোচ্ছেন। সাথে আরেকটি কথাও জানিয়ে দিলেন ডাক্তার নাকি তাকে বলে গিয়েছিলেন এই রোগী বাচবে না তাই কোন ক্রমেই যেনো রোগীর নিকট থেকে দুরে না যাওয়া হয়। নার্সের চোখে মুখে এক জীবন জয়ের হাসি। পলাশকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেও সেদিন তৃপ্তি পেয়েছিলাম।

বাবার নিকট থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি অনেক। সম্মূখ যুদ্ধে বাবা যখন যশোরের কাগজপুকুরে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন, পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে তখনো তিনি বাঁচার আশা করেননি। ২০০৮ সালে স্বাধীন দেশে ডাক্তারের চরম ভুল এবং অবহেলায়ও বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে আমাকে সংসারের হাল ধরিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন, যেতে পারেননি। এখনো শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। বাবাকে হয়তো কখনো বলা হয়নি ”বাবা তোমাকে আমি অনেক অনেক ভালবাসি”। তবুও বাবা জানেন কতটা ভালবাসি তাকে। পৃথিবীর শুরু থেকে পিতা-পুত্রের যে পৈতৃক ভুল বুঝাবুঝির দ্বন্দ সেটা আমাদের মাঝে নেই। বাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা যতদিন অটুট থাকে ততদিন দ্বন্দ হওয়ারও কথা নয়। পলাশের রক্ত তোমার ধমনীতে নিয়ে বেঁচে থেকো বাবা ছাঁয়া হয়ে, যদিবা কখনো ভুল বুঝি শুধরে দিয়ে বেঁচে থেকো বাবা আমাদের ভালবাসায় শিক্ত হয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *