স্মৃতিতে জাহাঙ্গীর

বয়সে এক বছরের বড় হলেও ক্লাসে এক ক্লাস জুনিয়র ছিলো জাহাঙ্গীর। সম্পর্কে ভাতিজা (সাহেব আলী মিয়া ভাইয়ের বড় ছেলে) হলেও বয়স আর ক্লাস মিলিয়ে সম্পর্ক ছিলো তুই সম্পর্কীয়। আমি চাচা তবুও আমাকে বয়সে ছোট হওয়ায় সে তুই করেই সম্বোধন করতো। আবার ক্লাসে জুনিয়র হওয়ায় আমিও তাকে তুই সম্বোধন করতাম। একসাথে একই স্কুলে যাওয়া আসায় সম্পর্ক ছিলো গভীরতম। স্কুলে কিম্বা খেলার মাঠে বা হাটে সর্বত্র ছিলো একসাথে যাতায়াত। বাকপটু জাহাঙ্গীর কথা বলার সময় এমন ভাব নিতো যে মিথ্যা কথা বললেও সামান্যতম চেহারার পরিবর্তন হতো না। তাই অনেক সময় তার মিথ্যাকে সত্য ভেবে বিব্রত হতে হয়েছে আমাকে। আবার হাসির খোরাক যোগাতো জাহাঙ্গীর বিভিন্ন সত্য মিথ্যা গল্প বলে। তবে সবচেয়ে বাস্তব গল্পগুলো ছিলো তার বাবা এবং ছোট ভাই মুরাদকে নিয়ে। অভাবের সংসারে তার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ইচ্ছায় চলতো তার লেখাপড়া। তার বাবাকে আমরা মিয়া ভাই সম্বোধন করেই ডেকে আসছি আজ অবধি। প্রতিদিন সকালে পরের জমিতে চাষাবাদ বা কামলা দিয়ে বিকালে হাটে কাঁচা তরকারি ও ফল বাকিতে কিনে হাটেই বিক্রি করে গৃহস্থের টাকা শোধ করতো আর লাভের টাকায় সংসার চালাতো। এই মিয়া ভাই একজন সাধারণ মানুষ হলেও অসাধারণ কিছু কথা বলতেন। মাঝে মাঝে নিজে শুনতাম কিম্বা জাহাঙ্গীরের নিকট থেকে শুনতাম আর দুইজনে হেসে গড়াগড়ি খেতাম।

একবার সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরের খোঁজে তাদের বাড়িতে গেলাম। ঘরের বারান্দার নিচে পড়ে থাকা একটি ছেড়া হাফপ্যান্ট তুলে মিয়া ভাই হাক ছাড়লেন “এ্যাই ভাল একটা ছেড়া প্যান্ট কে ফ্যালাইছে-রে”। আমি আর জাহাঙ্গীর এই ভাল এবং ছেড়া প্যান্টের অর্থ খুঁজে বের করতে না পেরে হাসতে হাসতে সেই রাতে ঘুমোতে পারিনি। জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই মুরাদ তখন ছোট। সবে কথা বলা শিখেছে তবে সকল শব্দ তখনও আয়ত্বে নিতে পারে নাই। পানিতে পাটের পঁচন চলছে, মশার উপদ্রব তখন অস্বাভাবিক। তো মুরাদকে মশায় কামড়ায় আর মুরাদ সেগুলোকে তাড়ায়। এক সময় বিরক্ত হয়ে তার বাবাকে ডাক দিলো “আব্বা গরুতে খালি কামড়াচ্ছে”। শুনে সবাই গরু তাড়ানোর জন্য ব্যস্ত হলেও গরু খুঁজে পাওয়া গেলোনা। আর যা খুঁজে পাওয়া গেলো তা শুনে হাসতে হাসতে সবাই খুন। স্বল্প শব্দ জানা মুরাদ মশার কামড়ে বিরক্ত হয়ে মশার নামটিই ভুলে গিয়েছিলো তাই মশাকে গরু বলেছিলো।

মুরাদকে বাংলা অক্ষরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। অ আ পড়াতো মিয়া ভাই। একদিন মিয়া ভাই জাহাঙ্গীরকে বললো মুরাদকে আগামী বছর ক্লাসে উঠিয়ে দিতে হবে তাই অ আ ক খ ভাল করে শিখাতে হবে। জাহাঙ্গীর রাজি হলো কিন্তু বাধ সাঁধলো মুরাদ। ঘুরে ফিরে বাবার নিকট আকুতি “আব্বা আমি ক্লাসে উঠবো না, ও আব্বা আমি ক্লাসে ওঠবো না, এই আব্বা আমি ক্লাসে ওঠবো না”। মিয়া ভাই নাছোড়বান্দা ক্লাসে উঠতেই হবে। বিরক্ত মুরাদ কিছুতেই ক্লাসে উঠবে না। এর কারন জানালো জাহাঙ্গীরের কাছে। মুরাদ বলে “ও ভাই আমি ক্লাসে উঠলে নামতে পারবো না, আমি ক্লাসে ওঠবো না”। জাহাঙ্গীর একা একা হেসে সুবিধা করতে না পেরে দৌড়ে আমার কাছে এসে বললো এই কাহিনী। দুইজনে হেসে লুটোপুটি সারাদিন। একদিন সন্ধ্যায় মিয়া ভাইকে খুব চিল্লাপাল্লা করতে শুনছি। এসময় জাহাঙ্গীর এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? সেই নিরস ভঙ্গিতে জানালো “দৌড়ে পাল্লা দিয়েছিলো, হেরে গিয়ে এখন চিল্লাচ্ছে।” কার সংগে পাল্লা দিয়েছিলো? সেই একই ভঙ্গিতে উত্তর দিলো “কার সাথে আবার, আমার সাথেই পারে না-তো কার সাথে দৌড় দিবে!!” শুনে হাসবো না কাঁদবো ঠাহর করতে কষ্ট হচ্ছিলো।

জাহাঙ্গীরের ছোট বোন জাহানারা চোখের সামনে ডায়রিয়ায় যখন মারা যায় তখন খাবার স্যালাইন বাজারে আসেনি। এক ‍মুষ্টি গুড়, এক চিমটি লবন আর দুই পোয়া পানির দ্রবনে খাবার স্যালাইন তৈরী করা শিখেছিলাম প্রাইমারি স্কুলে। জাহাঙ্গীর দুই মগ স্যালাইন রাগ আর অভিমানে পান করে আফসোস করে বলেছিলো “শালার স্যালাইন তুমি আসলে ঠিকই জাহানার মরে যাওয়ার পরে”। খুব মনোযোগ দিয়ে আমরা খাবার স্যালাইন তৈরী করা শিখেছিলাম। মুরাদ এখন অনেক বড়, জাহাঙ্গীর আরো বড়। জাহাঙ্গীর এখন এত বড় যে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এখন ইচ্ছে হলেও জাহাঙ্গীরের সাথে কথা বলা যায় না বা হেসে লুটোপুটি হওয়া যায় না, এখন সে অধরা। ইচ্ছে হলেই এখন আর ডানা মেলে মাঠে বা হাটে যেতে পারি না জাহাঙ্গীরের সাথে। সে এখন যোজন যোজন দূরে। ঢাকার এক নামকরা আইনজীবীর সহকারী ছিলো জাহাঙ্গীর। অভাবের সংসারে সুখের ঝড়ো বাতাসে বাড়িতে আসে জাহাঙ্গীর। সদ্য বিবাহিত নববধু নিয়ে সুখস্বপ্নে বিভোর জাহাঙ্গীর হঠাৎ ব্লাড প্রেসারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় চলে যায় জাহানারায় কাছে। ব্লাড প্রেসার সম্পর্কে বাড়ির লোকদের তেমন কোন ধারনা না থাকায় অকালে হারিয়ে যায় জাহাঙ্গীর। মিয়া ভাইয়ের একরাশ স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেলো জাহাঙ্গীর না ফেরার দেশে। মিয়া ভাই, ভাবি, মুরাদ এখনও আছে। জাহাঙ্গীর শুধু জাহানারার দেশে। সেই হাসি আর গল্প এখন শুধুই স্মৃতি। স্মৃতির আকাশে আজও চিরভাস্মর জাহাঙ্গীর, যেখানেই থাকিস ভাল থাকিস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *