প্রসঙ্গ- বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত

ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বাংলা দেশাত্ববোধক গানের সূচনা। ১৮৬৮ সালে সত্যেন্দ্র নাথ ঠাকুর রচনা করেন “মিলে সবে ভারতও সন্তান” গানটি। বাংলা ভাষায় রচিত এই গানটি ভারতবর্ষের প্রথম উল্লেখযোগ্য দেশগান। ১৯০৫-এ রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর বাংলা দেশগানের পূর্ণ বিকাশ ঘটান। বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাবে স্ফুরণ ঘটে গণসঙ্গীতের। নজরুলের লেখা “জাগো অণুশনও বন্দি ওঠরে যতো” গানটি প্রথম বাংলা গণসঙ্গীত। দেশ চেতনা আর শ্রেণী চেতনার যুগল সম্মিলনে চল্লিশের দশকের বাংলা গণসঙ্গীত হয়ে ওঠে এক অনবদ্য রত্নভান্ডার। পঞ্চাশের দশকে মহান ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকে গণ আন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান, সত্তুরের দশকের প্রারম্ভেই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, এসবের পিছনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে দেশগান আর গণসঙ্গীত। সংগ্রামের আবেগে, মুক্তির আকাঙ্খায় এসময় যেনো বান ডেকেছিলো সৃজনশীলতার। রচিত হয়েছিলো অজস্র গণসঙ্গীত, জাগরনের গান। জেগে উঠেছিলো জাতি, অর্জন করেছিলো বিজয়। মহান মুক্তিযুদ্ধ ধারন করেছিলো আমাদের দেশগান আর গণসঙ্গীতের সমগ্র ঐতিহ্যকে। তাই ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ বরোধী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের লেখা একটি দেশগানই আজ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত… আমার সোনার বাংলা।

গানটি কবি গুরু ১৯০৫ সালে রচনা করেছিলেন, [ ইংরেজ শাসক কর্তৃক বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে]। বাংলার এই অপরূপ শোভা তিনি দেখেছিলেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে থাকাকালীন সময়টিতে। শিলাইদহে কবি ‘গগন হরকরার’ দেখা পান। গগন হরকরার কন্ঠে গীত,” আমি কোথায় পাবো তারে” এর বাউল সুরের অনুকরণে এই গানটিতে সুরারোপ করেন রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এই গানের প্রথম দশ লাইনকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মনোনয়ন করেছিলেন। জাতীয় সঙ্গীত কম্পোজ করেছিলেন সুরকার সমর দাস !!

আমার সোনার বাংলা,

আমি তোমায় ভালোবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস

আমার প্রাণে, ওমা আমার প্রাণে বাজায় বাঁশী।

ওমা ফাগুণে তোর আমের বোলে, ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায়রে..

ওমা অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে কি দেখেছি মধুর হাসি।

কি শোভা, কি ছায়াগো, কি স্নেহ কি মায়াগো

কি আঁচল বিছায়েছো বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে

মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মত, মরি হায়, হায়রে..

মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়নজলে ভাসি।

তোমার এই খেলাঘরে, শিশুকাল কাটিলোরে

তোমার এই ধূলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানিক।

তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কি দীপ জ্বালিস ঘরে

তখন খেলাধূলা সকল ফেলে

তোমার কোলে ছুটে আসি।

ধেনু চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে

সারাদিন পাখীডাকা ছায়ায় ঢাকা তোমার পল্লীবাটে।

তোমার ধানে ভরা আঙ্গিণাতে জীবনের দিন কাটে

ওমা, আমার যে ভাই তারা সবাই, তোমার রাখাল তোমার চাষী।

ওমা তোর চরণেতে, দিলেম এই মাথা পেতে

দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।

ওমা গরীবের ধন যা আছে তাই দেবো চরণতলে

আমি পরের ঘরে কিনবো না তোর ভূষণ বলে গলার ফাঁসী।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *