ছুফিছাপ কাকা

৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা মানুষটি বয়সের ভারে নুব্জ, কুঁজো(নুয়ে) হয়ে হাটতেন। হাতে থাকতো একটি বাঁশের লাঠি। চুল, দাড়ি, ভ্রু লম্বা সাদা একেবারে কাশবনের দৃশ্য। চোখ দু’টি বড় গর্তের মধ্যে ভাজ করা চামড়ায় আড়াল করা। গায়ের রঙ ফর্সা হওয়ায় সাদা পাঞ্জাবী ও সাদা লুঙ্গি/ধুতিতে ভিনদেশী সাদা মানুষের মতই দেখা যেতো। লম্বা কদমে হাটতেন তিনি, আচমকা দেখে দু একবার ভয় পায়নি এমন সহপাঠি ছিলোনা। আমি নিজেও কয়েকবার ভুত ভেবে ভয় পেয়েছি। তবে আত্মীয়তার সুবাদে তিনি আমাকে আদর করতেন বলে ভয় পেলেও তিনি আদর করে সে ভয় ভুলিয়ে দিতেন। পুরো নাম ছুপি মোঃ তাহাজ্জত ইসলাম। গ্রামের সকলের নিকট ছুপিছাপ (ছুপি সাহেব) বলে অধিক পরিচিত ছিলেন। সম্পর্কে চাচা হওয়ায় আমি ডাকতাম ছুপিছাপ কাকা। একমাত্র কন্যা সন্তান হালিমাকে বিয়ে দিয়ে নিজ বাড়িতেই রেখেছিলেন। হালিমাকে এলাকার লোকজন হালি বলেই ডাকে। আর পুত্র সন্তান না থাকায় কাকিকে সবাই হালির মা বলেই ডাকতো।

ছুপিছাপ কাকার ছিলো ঝাড় ফুঁক দেওয়ার বিশেষ গুন। তিনি আরবীতে কাগজে এবং বিভিন্ন ধাতুতে তাবিজ লিখে দিতেন। হাতজশ ছিলো অনেক। দুর দুরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতো তাবিজ আর ঝাড় ফুঁক নিতে। ছোট বেলায় আমার গলায় যে তাবিজের বহর ছিলো সেগুলো সবই ছুপিছাপ কাকার দেওয়া। তাবিজের সাথে রুপার চতুর্ভূজ আকৃতির একটি বড় প্লেটও ছিলো আমার গলায়। ঐ প্লেটে আরবী হরফে খোদাই করা লেখাটাও ছুপিছাপ কাকার। আমার দশ বছরের ছোট ভাইকেও কাকা একইভাবে তাবিজ দিয়েছিলেন। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার পথেই ছুপিছাপ কাকার বাড়ি। একদিন স্কুলে যাওয়ার পূর্বে মা বললেন স্কুলে যাওয়ার সময় যেনো পাটা নিয়ে যাই ছুপিছাপ কাকার কাছে। পাটার ওজন অনেক তাই ভয়ে পাটা না নিয়ে লুকিয়ে স্কুলে চলে যাই। স্কুল থেকে ফেরার পর পাটা না নেওয়ার অপরাধে যখন মায়ের হাতে কানমলা খেলাম তখন জানলাম আমার বুকে ছুপিছাপ কাকার লেখা রুপার প্লেটটাকেই পাটা বলে। কষ্টে না কেঁদেও সেদিন হেসেছিলাম। এই পাটা সেই শিশুবেলায় গলায় ঝুলিয়ে বেড়িয়েছি আর আজ বালকবেলায় সেটি বহিবার ভয়ে লুকিয়েছি। যাই হোক সন্ধার আগেই ছুপিছাপ কাকার নিকট থেকে সেই পাটা লিখে নিয়ে এসে ছোট ভাই পলাশের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম।

ছুপিছাপ কাকা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন তার কাব্য প্রতিভার কারনে। শুনেছি ছুপিছাপ কাকা বালক বয়সে পালায় কবি গান গাইতেন। বেশ সুনামও ছিলো তার কবি গানে। কবি গানের বৈশিষ্ট হচ্ছে নিজেই গান রচনা করে গাইতে হয়। গান রচনার ক্ষেত্রে ছুপিছাপ কাকার জুড়ি ছিলো না। তবে আমার সৌভাগ্য হয়নি কাকার মুখে গান শোনার। ছুপি হওয়ার কারনে তিনি গান ছেড়ে দিয়েছিলেন অনেক আগেই। তবে ছড়ায় ছন্দে কথা বলাটা তার অভ্যাস। দন্দ্বতেও তার ছন্দ ছিলো। দেখা হলেই সালাম দিতাম। একবার আমার দাদাদের সাথে ছুপিছাপ কাকার সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে মনোমালিন্য হয়। আমার দাদার নাম ছিলো গনি মোল্লা আর অপর দাদার নাম ছিলো ছামেদ মোল্লা। ছন্দবদ্ধ কথামালা শোনার জন্য ছুপিছাপ কাকার প্রতিক্ষায় থাকথাম। এক সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে কাকার সাথে দেখা। যথারিতী সালাম দিয়ে প্রশ্ন করলাম কাকা অনেকদিন আমাদের বাড়িতে যান না। সঙ্গে সঙ্গে তিনি উত্তর দিলেন “গনি ধরছে ফনি, ছামেদ ধরছে লাঠি, আমি তাহাজ্জত কোন পথে হাটি”। ছন্দ শুনে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও তখনই বুঝি ছুপিছাপ কাকা সাধারন নন। একবার আমার নাম নিয়ে ছন্দ আঁকলেন “নাম রেখেছি হাফিজ, গলায় দিছি তাবিজ, হবি দেশের কান্ডারী, সবাই দেবে সেলামী”

সন্তান জন্ম হলে ছুপিছাপ কাকাকে দাওয়াত করে খাওয়ানো হতো শিশুর সুন্দর নাম রাখার জন্য। আমার নামটাও সম্ভবত কাকার রাখা। নতুন গাছের প্রথম ফল খাওয়ানো হতো কাকাকে। নতুন ঘর দিলে মিলাদ পড়ানো হতো কাকাকে দিয়ে। দুহাত তুলে মোনাজাত শুরু করলে চোখের পানি আটকানো যেতোনা। ছন্দবদ্ধ সে আকুতি আল্লাহর আরশ কাঁপাতো। কাকার সকল সম্পত্তির একমাত্র ওয়ারিশ হালি আপা এখনো আছে। হালি আপার বড় ছেলে হারুন ছিলো ছুপিছাপ কাকার জানের জান। হারুনও চমৎকার গান গাইতো। হারুনও নেই ছুপিছাপ কাকাও এখন নেই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। এখন বুঝি এই বরেন্য কবির যোগ্যতা থাকা স্বত্বেও শুধু সংরক্ষনের অভাবে তার ছন্দময় কথামালার অবসান হয়েছে। হয়তো সঠিকভাবে তার কথামালা সংরক্ষিত হলে তিনি থাকতেন ইতিহাসে কবির আসনে। কারো কাছে তিনি কবি হোক না হোক আমার কাছে তিনি কবি। না ফেরার দেশে ভালো থেকো ছুপিছাপ কাকা, দেখা হবে আবার কখনো….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *