অনামিকা

post

বাগান বাড়ির পিছনে কুল-কুল শব্দে প্রবাহিত হওয়া নদীর জলের ছন্দ শুনতে ভাল লাগতো অনামিকার। শুক্লাপক্ষের রাতে ভাটিয়ালী গানের সুর তুলে সে সুর নদীর স্রোতের সাথে ভাসিয়ে দিতো অজানায়। প্রবহমান স্রোতের সাথে সে সুরের রেশ থাকতো অনেকটা সময়। সম্মূখেতে নদীর চর জাগা মাঠে সাদা রং-এ আল্পনা আঁকা ঘন কাশফুলের সঙ্গে সময় পেলেই গল্প করতো অনামিকা। বাতাসে ঢেউ খেলে যাওয়া কাশফুল শিহরণ জাগাতো উদ্যম হৃদয়ে। কখনো কখনো বন বিড়াল বা শিয়ালেরা উঁকি দিয়ে দেখে যেতো অনামিকাদের নির্জন বাড়িটি। রাতের আধারে সীমানার অদুরের গ্রামটিতে দু’একটি পিদিম জ্বালানো আলো দেখিয়া মানুষের বসতি উপলব্দি হতো।

শুক্লাপক্ষের রাত অনামিকার দারুন পছন্দের। প্রিয়তম কৌশিককে নিয়ে মাঝে মাঝেই চলে যেতো বাবার শখের বাগান বাড়িতে। নদীতে জোয়ার থাকলে অনামিকার হৃদয়ে ভালবাসার উচ্ছলতা উপচে পড়তো দুকুল বেয়ে। কৌশিকের কোলে মাথা রেখে তার প্রিয় গানগুলো গাইতে থাকতো অনবরত। কৌশিক শোনাতো তার প্রিয় কবিতার শব্দাবলী। শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক শুনে জড়িয়ে ধরতো কৌশিকের দেহ। এসব এখন কেবল অনামিকার সুখ স্মৃতী।

স্কলারশীপ পেয়ে কৌশিক পা বাড়ায় মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে। ভিনদেশে গিয়ে কৌশিক ভুলে যায় অনামিকাকে। সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হয়ে যায় অচেনা। অনামিকা তবু হাল ছাড়েনা। একাকী বাগান বাড়ির আকাশ পানে চেয়ে চন্দ্র আর তারাকে সঙ্গী করে গল্প করে সারারাত। পিতার ব্যবসার সাথে অংশীদারিত্ব করতে বারবার তাগিদ দেয় ধন্যাঢ্য বাবা। একবার ভাবে ব্যবসার সাথে জড়িয়ে সকল স্মৃতী ভুলে যাবে। কিন্তু পরক্ষনেই আবার স্বপ্ন দেখে কৌশিককে নিয়ে।

যানজটের শহরে ইটের স্তুপে সাজানো অট্রালিকাগুলো বড়ই অস্বস্থিকর লাগে অনামিকার কাছে। তাইতো প্রায়ই ছুটে কোলাহল ছেড়ে দুরে বাগান বাড়িতে। একাকি সেখানে বেশী সময় ভাল লাগেনা তার। নদীর পানিতে ঢিল ছুড়ে আঘাত করে আনমনে। নদীর পানির রঙ দেখে অচেনা অচেনা মনে হয়। নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, এইকি সেই নদী? যে নদীর পাড়ে বসে কৌশিক তাকে কবিতা শোনাতো। শুল্কাপক্ষের রাতে এখন আর জোৎস্না ফুলঝুরি বর্ষণ করেনা আগের মতো। শিহরণ জাগেনা মনে কাশফুলের গায়ে বাতাসের ঢেউ দেখে।

দিন যায় অনামিকার মুখে বয়সের ছাপ ফুটে ওঠে স্পষ্ট। নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে পরাজয় বরণ করে অনামিকা তবু বিয়ের পিড়িতে নিজেকে বসাতে পারেনা। ভালবাসতে পারেনা অন্য কোন পুরুষকে, এক অজানা আশঙ্কায়। পৃথিবী ছোট হয়ে আসে তার। পিতার ব্যবসা সামলাতে ব্যস্ত অনামিকা সিদ্ধান্ত নেয় স্কলারশীপ নেওয়ার। পেয়েও যায় অনায়াসেই।

পাসপোর্ট ভিসাসহ সব কিছু ঠিক করা হয়, আগামী রবিবার ফ্লাইট। শেষবারের মতো বাগান বাড়িতে ছুটে যায় অনামিকা। সেই ঢেউ তোলা নদীতে এখন জেগেছে অনেক চর। বালুচরে ছোট ছোট বালকেরা খেলছে বল। কাশবনে নেই সাদার শুভ্রতা। তবুও বাড়িটাকে বড় আপন মনে হয়। কত স্মৃতী এই বাড়িকে ঘিরে। পিছন পানে তাকাতে তাকাতে বিদায় নেয় সুখ স্বপ্নের বাগান বাড়ি থেকে।

ভোরে ঘুম ভাঙ্গে অনামিকার। ব্যাগগুলো রাতেই গুছিয়ে রাখা হয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা খেতে বসে টেবিলে। টেলিফোন বেজে ওঠে স্বশব্দে।

রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে কৌশিক বলে ওঠে কেমন আছো অনামিকা?

থমকে দাড়ায় অনামিকা। কি উত্তর দিবে এই প্রশ্নের ভেবে পায়না। একবার ভাবে ফোন রেখে দিবে, কিন্তু পারেনা। কণ্ঠ শুকিয়ে আসে, নিজেকে জড় পদার্থের মতো মনে হয় অনামিকার।

কি ব্যাপার কথা বলছোনা কেন? আমি আজ রাতেই ঢাকায় ফিরেছি। ধৈর্য্যের পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ হয়েছো। আমি হেরে গিয়েছি তোমার বিশ্বাসের কাছে। আই এ্যাম সরি ডার্লিং তোমাকে অনাঙ্খিত পরীক্ষার সম্মূখীন করাতে। তুমি আমার খবর না জানলেও আমি তোমার খবর রেখেছি সর্বক্ষন। তোমার স্কলারশীপ নিয়ে বিদেশে যাওয়ার আর প্রয়োজন নেই। আমি এক্ষুনি আসছি তোমার বাসায়। অনেকদিন তোমাদের বাগান বাড়িতে যাওয়া হয়না। তুমি দ্রুত তৈরী হয়ে নাও।

কথাগুলো একনাগাড়ে বলে থামে কৌশিক। যাকে খুজতে মাতৃভূমি ছেড়ে দুরদেশে পাড়ি দিতে রওনা হচ্ছিলো অনামিকা তাকে এতো সহজে কাছে পেয়ে যাবে ভাবতেও পারেনি সে। চোখের কোনে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে মনের অজান্তে। বাবা নাস্তার টেবিলে হা করে তাকিয়ে আছে অনামিকার দিকে। বাবার চোখ থেকে নিজের চোখ আড়াল করে শুধু বলে “তাড়াতাড়ি এসো”।

Leave a reply